সেটা হল শিক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইউএস বিডি টাইমস :

সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণে যার অবদান সব থেকে বেশী, সেটা হল শিক্ষা। জ্ঞানের কোন স্থান কাল পাত্র নেই । নেই কোন উঁচু-নিচু প্রভেদ । তবে শিক্ষার জন্য যার গুরুত্ব সব চেয়ে বেশী, সেটা হল শিক্ষা গ্রহনের মানসিকতা এবং যেই পাত্র সেই জ্ঞান ধারণ করবে , তার তা ধারণ  ও গ্রহনের সক্ষমতা ।মানব মস্তিষ্ক বিস্ময়কর, বিস্ময়কর তার গতি-প্রকৃতি ও আচরণ । শিশুর চিন্তা-ভাবনা অনুধাবন করার জন্য বাবা-মাকে আন্তরিক হতে হবে। আমাদের একটা প্রচলিত আমূল বিশ্বাস এই যে, আমাদের মানব মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা হয়ত এর বেশী ধারণ করার জন্য উপযুক্ত হবে না। আমাদের মানব মস্তিষ্কের ক্ষমতার হয়ত একটা সীমা রয়েছে, তবে তা আমাদের চিন্তা-চেতনার বহুগুণ ঊর্ধ্বে এবং বিধাতার মানুষকে দেয় সবচেয়ে দামী উপহারগুলোর মাঝে একটি। মানব মস্তিষ্কের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের একটি হল এর বহুমুখী আচরন এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় দ্রুত নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বলা হয়ে থাকে, “ যে শিশু মায়ের কোলে বসে চাঁদ দেখে, বিশ্ব একসময় তার চোখ দিয়ে আগামী দেখে। ”মানুষের সামাজিক পরিবেশ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথম ভার্সাই সন্ধির শর্তগুলো হিটলারকে কতটা ক্ষুব্ধ করেছিল, তা আমাদের অজানা, আমাদের কাছে এটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়, হিটলারের ফুয়েরার হওয়ার পিছনে তার পরিবার, তৎকালীন নাগরিক সমাজের অবদান কতটুকু? নজরুলের সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা তার আনোয়ার, কামাল পাশা লেখার পেছনে কতটা প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে তা আমাদের সম্পূর্ণ বোধগম্য নয়,তবে দারিদ্র তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা শুধু তার জ্ঞানের পরিধি বিস্তারে সাহায্য করেছে এমন নয়, বরং বাংলা সাহিত্যে আমরা পেয়েছি বিদ্রোহী, সাম্যবাদী, কুলি-মজুর, পাপ, মানুষ এর মত বিবেকবোধ জাগ্রত করা অমর কবিতা। “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ঠ , মুক্তি সেখানে অসম্ভব”- ‘শিখা’ পত্রিকার প্রারম্ভে লিখিত উক্তি যদিও তা ছিল তৎকালীন জরাজীর্ণ মুসলিম সমাজকে আড়মোড়া ভেঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহবান, আসলে তা সকল সময়, সকল কালের জন্য এক কালোত্তীর্ণ উক্তি। আমার নিজস্ব কিছু বিশ্বাস ও চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে, নিচের কয়েকটি অনুচ্ছেদে, তবে মানব মাত্রই মিশ্রিত চিন্তা-ভাবনায় জড়িত। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। টমাস আলভা এডিসনের ভাষায়, “একটা কাজ পরিকল্পনা মাফিক সফল না হওয়া মানে গোটা পরিকল্পনাটাই যে ভুল এমনটা নয়।” চিন্তা-চেতনার বিশুদ্ধতা আসে সমালোচনার মাধ্যমে, তবে চিন্তা ও বিবেকের দরজা কখনো বন্ধ করা উচিৎ নয়, তা হলে তা হবে আমাদের আত্নার চাহিদার প্রতি অবিচার।

১। শারীরিক শিক্ষার ও খেলাধূলার অপরিহার্যতা বিগত সকল শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টেই এসেছে। কিন্তু তার সঠিক কার্যকারিতা পাওয়ার জন্য যতটুকু অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকা দরকার , তা অর্জন করা কোন একক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে সম্ভব নয়, প্রয়োজন সরকারি সাহায্য। শারীরিক শিক্ষা মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধির একটি প্রধান হাতিয়ার। আমার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, যারা তাদের স্কুল জীবনের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তাদের পরবর্তী জীবনে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতির হার অনেক কম।

২। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ শারীরিক পরিশ্রমের মতই তাৎপর্যপূর্ণ । পাঠ্যসূচীতে intelligence quotient বিষয়ক আলাদা পাঠ্যপুস্তক থাকা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরূরী। শব্দভেদ, গাণিতিক ধাঁধাঁ, সম্পর্ক নির্ণয়, সামাজিক জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাৎক্ষণিক মোকাবেলা করার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ত্ব শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যত জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলা পৃথিবী বৈচিত্রময়, এখানে মানুষের সাথে সংগ্রাম করে না বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সে আগামীর পথে পা বাড়াবে তার কৌশল নির্ণয় করা জরূরী, এ পথে পা বাড়ানোর জন্য তার শিক্ষাক্রম যেন সুহৃদের মত আচরণ করে, তার দিকে লক্ষ্য করা অত্যন্ত জরুরী।

৩। আমি নিবিড় তত্ত্বাবধানের পক্ষপাতী ছিলাম সব সময়। হোস্টেল ও হল ভিত্তিক পড়া-শোনা শুধু যে পড়া শোনার প্রতি আগ্রহ তৈরী করে তাই নয়, বরং ভবিষ্যত জীবনের জন্য আদর্শ সামাজিক মানুষ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার । সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী এই ধরণের বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কোন একক ব্যক্তি- প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, শুধু সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছাই পারে এ মহা কর্ম যজ্ঞ সাধন করতে। সরকার প্রয়োজনে Public-Private Partnership (PPP) এর সাহায্য নিতে পারে ।

৪। আমি Co-educational system এর স্বপক্ষে ছিলাম না সংগত কারণেই। আমার এই বিশ্বাস এখনো বর্তমান। মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে এটা এখন পর্যন্ত আমাদের কার্যকারী ফলাফল এনে দিতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও এটা অতীত কেই অনুসরণ করবে, এটাই অতি সাধারন অনুমেয়। তবে সহ-শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে ডিবেটিং ক্লাব, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ক্লাব, স্কাউটিং, ইংরেজী সাহিত্য ক্লাব , ধাঁধাঁ ও গাণিতিক বিশ্লেষণ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।

৫। কিশোর-কিশোরী দের বয়ঃসন্ধিকাল তার জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ এ সময়েই শারীরিক ও মানসিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ সব চেয়ে বেশী ঘটে।কৈশোরের পথ মাড়িয়ে একজন কিশোর তখন যুবক হয়ে উঠে। আমি সব সময় মনে করি, সেই সমাজ আদর্শ যার যুবকেরা আদর্শের পথে অক্লান্ত পান্থ, সেই সমাজ সর্বোত্তম যার যুবকেরা নবী-রাসুল, পবিত্র আত্নাকে অনুসরণ করে আর তাদের চরিত্র নিজেদের চরিত্রে ধারণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলে। ভাল হওয়ার, উওম হওয়ার, মহৎ হওয়ার সাধনার চেয়ে উত্তম পরিশ্রম আর নেই। যৌবনকাল যেমন জীবনের পরম আরাধ্যের বিষয় তেমনি এ সময়ই বিধাতা মানুষের সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা নেন। এ সংকটময় মুহূর্তে যাদের সাহায্য, যাদের নৈকট্য সবচেয়ে বেশী দরকার তারা হল অভিভাবক। এ সময় তাদের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করা, তাদের সময় দেয়া , তাদের সাথে পরামর্শ করা সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ।

৬। শিশু-কিশোরদের সাথে মেশার জন্য আপনাকে কিছুটা সময় শিশু হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটা যে শুধু শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমনটা নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষের সাথে ভালভাবে মেশার জন্য কিছুটা তাদের মত ভাষা-আচরণ, অভ্যাস রপ্ত করা জরুরী। যাদের মানুষের সাথে নিত্য চলাচল, সেই সব রাজনীতিজ্ঞদের এই অভ্যাস রপ্ত করা একান্ত জরুরী।

৭।আজকের শিশু আগামী দিনের পিতা,স্বামী, অভিভাবক।বলা হয় “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে”। পিতা-মাতার পারস্পরিক বিরূপ আচরণ শিশুর অন্তরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর সহনশীল মনোভাব বিবাহিত জীবনের শুরু থেকেই রপ্ত করা উচিত, যাতে অনাগত সন্তান জীবনের শুরু থেকেই ভাল পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। তাছাড়া, ‘আমিই সঠিক’ -এ ধরণের মনোভাব ত্যাগ করা উচিত । কারণ, ইতিকথার পরেও কথা থাকতে পারে, জীবনের পরেও জীবন আছে।

৮। পিতা-মাতার সততা, উত্তম আচরণ তার সন্তানের কাছে পরম আরাধ্যের বিষয়। সকল আর্থিক-বৈষয়িক সমস্যা সমাধানে জ্ঞান-বুদ্ধির সাথে মোকাবেলা করা উচিত, এ জন্য বিকল্প পথে পা বাড়ানো উচিৎ নয়। ব্যক্তিগত বাজেটে সঠিক খাতে অর্থ বরাদ্ধের ক্রম নির্ণয় পৃথিবীর কঠিন কাজের একটি। সুতরাং, এ বিষয়ে সন্তানকে দীক্ষা দান করা পিতা-মাতার প্রাথমিক কর্তব্যের একটি।

৯। সমাজ জীবনে চলতে গেলে বন্ধুর সাহচর্য সবচেয়ে বেশী দরকার। একজন ভাল বন্ধু হওয়ার পূর্বশর্ত ভাল মানুষ হওয়া। আর্থিক লেনদেনে যার মাঝে সরলতা,স্বচ্ছতা নেই, তাকে বন্ধু না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাছাড়া বন্ধুদের সাথে চলতে গেলে যে অপরের পকেট থেকে অর্থ, চরিত্র ও শারীরিক বিনাশ সাধনের চিন্তায় মত্ত থাকে, সে কখনোই আদর্শ বন্ধু নয়। তাকে ভল্লুকের কানে কানে বলে যাওয়া সেই গোপন কথাটা বলে দেওয়া উচিৎ, ” A friend in need is a friend indeed”. অপরের গোপনীয়তা যে তোমার কাছে উন্মুক্ত করে, তার সাহচর্যে না যাওয়াই উত্তম। এক মনীষী বলেছিলেন, ” মানুষ সেই রকমই, প্রাত্যহিক জীবনে সে যেমন কথা বলে”। সুতরাং, ” দুষ্ট গরূর চেয়ে শূণ্য গোয়াল ভাল”। জীবনের সকল পর্যায়ে সংগী-সাথী গুরূত্বপূর্ণ আর সঙ্গী সাথী নির্বাচনে তার সঙ্গী কেমন, এটা লক্ষ্য করা জরুরী। জীবনে অধিকার অর্জনের চেয়ে কর্তব্য পালন বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজনের অধিকারই আরেক জনের কর্তব্য।

১০। শিক্ষা সামগ্রিক একটা বিষয়। এটাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করাই ভাল। একটা ভাল বই নির্দিধায় একজন ভাল বন্ধু, তবে তার আগে বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে। একটি ভাল বই কখনোই একজন মন্দ লোকের কাছে তার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় না। মন্দ লোক বই নিয়ে সংগ্রাম করতে পারে, কিন্তু এটা থেকে এক বিন্দু রস আহরণ করতে পারে না।সূরা বাকারার ২ নং আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন বলেছেনঃ “এই সেই মহা গ্রন্থ আল-কোরআন, তাতে কোন সন্দেহ নেই, যারা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে এই কিতাব কেবল তাদের জন্যই পথপ্রদর্শক।” সুতরাং, কোরআন থেকে নির্যাস আহরণ করার জন্য আগে ঈমান আনতে হবে। এই নিয়ম আল্লাহ পৃথিবীর সকল বস্তুতেই রেখে গেছেন। পৃথিবীর সকল ভাল বস্ত থেকে ভালটা বের করে আনার জন্য আগে নিজে ভাল হতে হবে। ফলদায়ী বৃক্ষের পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য নিবিড় তত্ত্বাবধান দরকার, আগাছার জন্য নয়।

১১। উচ্চ শিক্ষার ব্যয় সাম্প্রতিক কালে লাগামহীন ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা হ্রাস করার জন্য আইন,বিধি-বিধান করার চেয়ে কৌশল গত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে সব থেকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। দেশ খ্যাত শিক্ষকদের পাঠ দান অনলাইনে ইউটিউবের মাধ্যমে দেশের সকল শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। দেশে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে শিক্ষামূলক সফটওয়ার ও E-contents এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে সেল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশী। সুতরাং, মোবাইল ফোন ভিত্তিক শিক্ষাদান শিক্ষাবিস্তারে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে বিবিসি জানালা ইংরেজী শিক্ষা বিস্তারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষামূলক সফটওয়ার, গেমস তৈরীতে নিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে । সরকারের উচিৎ এ ধরণের চেষ্টায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। তাছাড়া, ছাত্রজীবনে সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখতে অনেক ছাত্রই আন্তরিক থাকে কিন্তু সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশের অভাবে তাদের সুকোমল বৃত্তি অনেক সময়েই বিকাশ লাভ করে না।

১২। একটি সরকার একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ঢেড় ঢেড় বেশী শক্তিশালী। সরকারের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কৌশল নির্ধারণ। এ জন্য সরকার মহান জাতীয় সংসদের সাহায্যকারী হিসেবে দেশের সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী-গুণী ব্যাক্তিদের নিয়ে “House of Thinkers’ তৈরী করতে পারে। ছায়া সংসদ ও মিনি পার্লামেন্ট সংসদের বিকল্প নয় বরং সাহায্যকারী মাত্র। এর মাধ্যমে সংসদের কার্যকারিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নির্ধারণে সঠিক ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়া ঐ দলের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশী তাৎপর্য বহন করে স্থানীয় জনগনের জন্য। রাজনীতিতে সমালোচনা এক অপরিহার্য অংশ বলে বিবেচিত, কিন্তু সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা থাকা তার চেয়ে বেশী জরুরী। সমালোচনা করার জন্য সর্বোত্তম ভাষা ব্যবহার সর্বদাই জরুরী। ‘তালগাছ আমার’-এ ধরনের আচরন গণতন্ত্র চর্চার পথে এক বিশাল অন্তরায়। ‘বিচারের রায়’ সর্বদা আমার পক্ষে যাবে, এটা আশা করা সঠিক নয়। তবে, মানুষের বিবেকের আদালতই বড় আদালত। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে Adversarial system প্রচলিত, এটা Inquisitorial system এর বিপরীত। এতে যদি নিরপরাধ শাস্তিও পায়, কোন অপরাধী যদি নিরপরাধ বলে আদালতের কাছে স্বীকৃতও হয়, তাতে আসলে সত্য মিথ্যা হয়ে যায় না, দিবস রজনী হয়ে যায় না, পুর্ব পশ্চিম হয় না, উত্তর দক্ষিণ হয় না, ঈশাণ নৈঋত হয় না, বায়ু অগ্নি হয় না, ঊর্ধ্ব অধঃ হয় না। এটা আসলে একজন এডভোকেটের পরাজয়, তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের ব্যর্থতা, সঠিক ভাবে অনুধাবন ও বিশ্লেষণের অক্ষমতা। একজন এডভোকেটের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে, মামলার বিশ্লেষণ ও কর্মপদ্ধতি ঠিক করা। মামলা থেকে কতটা আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যাবে,তা অগ্রীম চিন্তা-ভাবনা করা ঠিক নয়। তাছাড়া, বলা হয়ে থাকে, “ Justice hurried, justice buried and Justice delayed, Justice denied.” গণমানুষের আইন থেকে Specific Relief এবং পর্যাপ্ত সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বার ও বেঞ্চ উভয়ের সদিচ্ছা ও সক্ষমতা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম আবু হানিফা শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ আলাদা করার পক্ষপাতী ছিলেন। দেশে “Rule of Law” প্রতিষ্ঠা করার জন্য আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ পরস্পরের মাঝে সুসম্পর্ক, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকা একান্ত অপরিহার্য।

১৩। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য আইনকে জনগনের কাছাকাছি থাকা অপরিহার্য, জনগণকে আইনের কাছাকাছি নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ক্ষুদ্র বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা পূনঃ মূল্যায়ন করা অপরিহার্য। অর্থ ও ক্ষমতা দুটোই অজ্ঞ ও অসৎ ব্যক্তির কাছে নিরাপদ নয়। এজন্য তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তবে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য আন্তরিক সদিচ্ছা, বিজ্ঞতা ও অন্তরের নিষ্কলুষতা থাকা সবচেয়ে জরুরী। উপজেলা পর্যায়ে পুনরায় আদালত ব্যবস্থা প্রবর্তন স্থানীয় পর্যায়ে বিচারিক কার্যে অব্যবস্থাপনা অনেকটাই ঢেকে দিতে পারে।

১৪। মানসিক দীনতা দূর করার জন্য ঈর্ষা ও অহংবোধ দূর করা সব থেকে বেশী জরুরী। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার নিজের ও সবার জন্য ‘অহং’ নামের এই ভয়ংকর রিপু দূর করার জন্য করজোড়ে প্রার্থনা করি। ত্যাগের চেয়ে পবিত্র আনন্দ আর নেই।

১৫ ইসলামের ৪র্থ খলিফা হযরত আলী বলেছিলেন, “ তুমি যদি আমাকে একজন ভাল মা দাও, তাহলে আমি তোমাকে একটি ভাল জাতি উপহার দিব।” একজন ভাল মা হওয়ার পূর্বশর্ত একজন ভাল স্ত্রী হওয়া, একজন ভাল পিতা হওয়ার পূর্বশর্ত একজন ভাল স্বামী হওয়া।স্ত্রীর সন্তুষ্টির আগে মায়ের সন্তুষ্টি। সে স্ত্রী আদর্শ মা নয়, যে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী থেকে স্বামীকে দূরে রাখতে নিরন্তর কৌশলে রত। স্বামীর পরিবার, প্রতিবেশী ও নিজের পরিবারের সকল সদস্যের সাথে যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, সেই আদর্শ মা। আর এ ধরনের মা ই পারে সন্তান কে আদর্শ মানুষ হিসেব গড়ে তুলতে।

১৬। পৃথিবীতে ‘না’ শব্দ টা ‘হাঁ’ শব্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই ‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রথম শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘না’। পৃথিবীতে সকল-অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করা, সকল ভাল কাজে ‘হ্যাঁ’ করার চেয়েও কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ। সত্য কথা বলার সাহস যার নেই, তার আসলে মেরূদণ্ডই নেই। আর যার মেরূদন্ড নেই, তাকে মেরূদন্ডী প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া চলে না। মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু মৃত্যুর সময় অনেকেই এই ‘আশরাফুল’ উপাধি নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারে না। পুঁতি-গন্ধময় পৃথিবীর জঞ্জাল থেকে পালানো কোন ভাল ও বীরত্বপূর্ণ কাজ নয়, বরং পৃথিবী থেকে জঞ্জাল সরানোর দায়িত্ব অপরের কাঁধে না দিয়ে নিজের পিঠে বহন করা উচিৎ।

১৭। পৃথিবীকে দেখা উচিৎ BiConvex Lens এর দৃষ্টিতে, অতি মায়া-মমতা এখানে অনেক সময় কুহেলিকার জন্ম দেয়। যা চোখের জন্য উপাদেয়, তা হয়ত বিবেকের জন্য উপাদেয় নয়। অর্থ-বিত্ত মানুষের চোখে অনেক সময় তৈরী করে ধুম্রকুন্ড, লোভ-লালসার পরিধি অনেক সময় সীমাহীন হয়ে যায়, তখন সে হয়ে যায় অন্ধ, বধির, যার কাছে বিবেকের কড়াঘাত পণ্ডশ্রমে পরিণত হয়। পৃথিবীর সকল ভাল সুকোমল বৃত্তিগুলো একে অপরের হাত হাত ধরাধরি করে আছে, মন্দ প্রবৃত্তিগুলো একে একে অপরকে জড়িয়ে আছে। এখন id ego আর Super Egoর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে তুমি Dr. jekyll হবে না Mr . Hyde হবে তা একান্তই তোমার ব্যাপার। তবে তুমি, আমি আমরা কেউ একা নই, আমাদের সাথে আছে কিরামান কাতেবীন, আছে প্রকাশ্য শত্রু বিতাড়িত আযাযীল, আর আছে পরম করুনাময় মহান রাব্বুল আলামীন, আর তাঁর কাছেই বিপদে-আপদে, সুখে-দঃখে সর্বদা হাত পাতা উচিৎ। আল্লাহর রহমত পাবার আশা থেকে শুধু অবাধ্য-বোকারাই হতাশ হয়। আর আমাদের অপেক্ষা করা উচিৎ সেই, “ Judgment Day” এর জন্য যেখানে শুধু আল্লাহর হুকুমই বিরাজ করবে, আর দুনিয়ার সকল প্রভাবক যেখানে অকার্যকর।

১৮। নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র যে শুধু পদার্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়, বরং তা মানবিক আচরনের বিপক্ষেও সমান কার্যকরী। সুতরাং, মানুষের সাথে ব্যবহারিক জীবনে চলা-ফেরার সময় এই দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া একান্ত জরুরী। আল্লাহ জিহ্‌বা দিয়েছে স্বাদ গ্রহনের জন্য, চোখ দিয়েছে দেখার জন্য, কান দিয়েছে শোনার জন্য, ত্বক দিয়েছে অনুভবের জন্য, মাথা দিয়েছে তা খাটানোর জন্য , বিবেক দিয়েছে বিবেক অনুসারে কাজ করার জন্য, শয়তানকে তৈরী করেছে তার বিপক্ষে মানুষকে যুদ্ধ করার জন্য। সুতরাং সকল অঙ্গের ব্যবহার করা উচিৎ এর প্রস্তুতকারীর নির্দেশ অনুসারে। আর রিপুর বিপক্ষে সংগ্রামের চেয়ে বড় যুদ্ধ কিছু নেই, হতে পারে না।

১৯। মানুষের ক্ষুদ্র একটি কাজ হয়ত তার জন্য নিতান্তই সামান্য, কিন্তু সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য তা হয়ত সুবিশাল গুরুত্ব বহন করে। তাই, কাজ ক্ষুদ্র বলে তা অবহেলা করা উচিৎ নয়। আবার, জগতের সবাই অপরাধে লিপ্ত হলেই ‘মন্দ’ ‘ভাল’ হয়ে যায় না। “পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে”-কোপার্নিকাসের শিষ্য জিয়োর্দানো ব্রুনোর তার গুরুর মতবাদ প্রচারের জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা তাকে Capital Punishment দিয়েছিল। অবৈধ,মন্দ কাজকে কোণ যুক্তি দিয়ে বিশুদ্ধ করা যায় না। অপরের সাথে ভাল আচরন করা উচিৎ অপরের আচরণ ভাল নয় বলে, বরং নিজে ভাল বলে। পিতা-মাতাকে সম্মান করা উচিৎ, কারণ এতে রাসূলকে সম্মান দেওয়া হয়, আল্লাহকেই সম্মান দেওয়া হয়। যে নিজের সজ্ঞানে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়, তাদের পক্ষে আল্লাহর ধ্যানে, আল্লাহর আরাধনায় মশগুল হোয়া সম্ভব নয়।

 

 

ইউএস বিডি টাইমস /রহমান

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>