ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে এফডিসি!

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইউএস বিডি টাইমস :

এবার ইট-কংকিট গ্রাস করবে এফডিসি খ্যাত তেজগাঁওস্থ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা। এখানেও বাণিজ্যের ছোঁয়া লাগছে। নির্মাণ করা হবে কমপ্লেক্সে আর এই কমপ্লেক্সে একাধিক সিনেপ্লেক্স, তিন তারকা হোটেল আর শপিং মলসহ চলচ্চিত্র নির্মাণের অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকছে। তখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা-বিএফডিসির নতুন নাম হবে বিএফডিসি কমপ্লেক্স।

রাজধানীর তেজগাঁওস্থ ৯৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হবে ১২ তলা ভবনের নতুন এই কমপ্লেক্স। আর এই প্রকল্পের জন্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্রকল্প প্রণয়নকারী বিএফডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আইয়ুব আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প নকশায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে— একটি অত্যাধুনিক শপিং কমপ্লেক্স, চলচ্চিত্রবিষয়ক পাঠাগার, ক্যামেরা লেন্সসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিক্রির ব্যবস্থা, কমপক্ষে দুটি সিনেপ্লেক্স, তিনটি শুটিং ফ্লোর, চারটি প্রদর্শনী কক্ষ নিয়ে তৈরি একটি মাল্টিপ্লেক্স, শিশুদের বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা, বিশেষ শিশুদের জন্য খেলার জায়গা, ফুড কর্নার এবং তিনটি বেজমেন্টস।

আগামী এপ্রিল মাস থেকে এই কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রকল্প প্রণয়নকারী বিএফডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আইয়ুব আলী। চলতি সপ্তাহে একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে বলেও জানা গেছে।

এফডিসির এমডি আমির হোসেন জানান, ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ ও এফডিসির আওতাভুক্ত গাজীপুরের ‘বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটি’ চালু হলে এবং একই সঙ্গে চলতি বছর এফডিসির ‘আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ছবি নির্মাণের জন্য নির্মাতাদের আর দেশের বাইরে যেতে হবে না, বরং বিদেশিরা এখানে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবেন।

উল্ল্রখ্য, ২০১২ সালের ৩০ অক্টোবরে এই বিষয়টি নিয়ে এফডিসিতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও তৎকালীন এমডির মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক হয়। আর ওই বৈঠকেই এফডিসিকে আধুনিকীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে এফডিসিকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করতে আর দেশীয় চলচ্চিত্রকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপ দিতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

বাঙালির চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাস
বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় কলকাতার ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির উদ্যোগে ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল বাকেরগঞ্জ জেলার ভোলা মহকুমার (অধুনা ভোলা জেলা) এসডিওর (অধুনা ডিসি) বাংলোতে। ১৭ এপ্রিল বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় ঢাকায় পাটুয়াটুলীর ক্রাউন থিয়েটারে। ক্রাউন থিয়েটারের অস্তিত্ব এখন আর নেই। এই বায়োস্কোপের ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন চলচ্চিত্র ছিল। গবেষক অনুপম হায়াতের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এই সব চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল মহারানী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি মিছিল, গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধ, তিনশত ফুট উঁচু থেকে প্রিন্সেস ডায়ানার লাফ, রাশিয়ার সম্রাট জারের অভিষেক, পাগলা নাপিতের ক্ষৌরকর্ম, সিংহ ও মাহুতের খেলা, ইংল্যান্ডের তুষারপাতে ক্রীড়া, ফ্রান্সের রাস্তাঘাট ও পাতাল রেলপথ ইত্যাদি। তখনও বায়োস্কোপের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্র দেখার জন্য সাধারণ দর্শকের টিকেটের ব্যবস্থা ছিল। টিকেটের দাম ছিল আট আনা থেকে তিন টাকা।

ঢাকার পাটুয়াটুলী ছাড়াও জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), ভিক্টোরিয়া পার্ক (বাহাদুর শাহ পার্ক), আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার বাইরে তৎকালীন মানিকগঞ্জ মহকুমার (অধুনা জেলা) বগজুরি গ্রামে, জয়দেবপুরে (অধুনা গাজীপুর জেলা) ভাওয়াল এস্টেটের রাজপ্রাসাদে, ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার (অধুনা শরিয়তপুর জেলা) পালং-এ বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া জমিদার শরৎকুমার রায়ের বাড়িতে বায়োস্কোপ দেখানো হয় ১৯০০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে কয়েক দিন ধরে। স্থানভেদে টিকেটের দামের তারতম্য ছিল। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক হিন্দুরঞ্জিকা পত্রিকায় এ নিয়ে একটি প্রতিবেন প্রদকাশিত হয়। ঢাকার আরমানিটোলার পাটের গুদাম থেকে নিয়মিতভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর গৌরবের অভিযাত্রা সূচিত হয় ১৯১৩-১৪ সালে। পরে এখানেই নির্মিত হয় ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল পিকচার হাউজ, যা পরে শাবিস্তান হল নামে রূপান্তরিত হয়।

কলকাতায় যে বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠিত হয়, তার মূল ভূমিকায় বাঙালিরা ছিল না। ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার (অধুনা জেলা) বগজুরী গ্রামের হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনী শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে সালে প্রতিষ্ঠিত এই দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানিই বাঙালির প্রথম চলচ্চিত্র-প্রচেষ্টা। অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও হীরালাল সেনের নাম স্বীকৃত। বিভিন্ন স্থানে অভিনীত নাটকের খণ্ডিত অংশের চিত্রায়ণ করে ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ক্ল্যাসিক থিয়েটারে প্রদর্শন করেন। সেই সময়ের সীতারাম, আলীবাবা, দোললীলা, ভ্রমর, হরিরাজ বুদ্ধ প্রভৃতি জনপ্রিয় নাটক পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ বিশেষ অংশ ক্যামেরায় ধারণ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রদর্শন করে তিনি বাঙালির চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রবল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন। প্রামাণ্যচিত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র এবং সংবাদচিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ হিসেবেও হীরালাল সেন নমস্য ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে অবিভক্ত বঙ্গ (১৯৪৭ পর্যন্ত) থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বোঝায়।

পৃথিবীর অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও (তদানীন্তন পূর্ব বঙ্গ) ১৮৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। এই সূত্র ধরে এই অঞ্চলে ১৯০০-এর দশকে নির্বাক এবং ১৯৫০-এর দশকে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন শুরু হয়। চলচ্চিত্র মঞ্চের উৎপত্তি ১৯১০-এর দশকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ১৯৫০-এর দশকেই। এখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খেতে চলচ্চিত্রের প্রায় ৫০ বছরের মত সময় লেগেছে।[১] ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেতো।[২] আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মত চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।[৩] এ হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বেশ বড়ই বলা যায়, যদিও এশিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে তা অনেকটাই উপেক্ষিত।

 

ইউএস বিডি টাইমস /রহমান

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>