এ কান্না বাবুল আক্তার কিংবা তার সন্তানের নয়, সমগ্র মানবতার কান্না

-আ.ফ.ম. মশিউর রহমান

usbdcvbnjuyhgtfc v

গত ৫জুন সকালের যে খবরটি সমগ্র জাতিকে বেদনাহত, স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ করেছে সেটি একজন নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের স্ত্রীর নৃশংস মৃত্যু। যেটিকে শুধু মৃত্যু বলাই যথার্থ নয় বরং একটি পরিকল্পিত, কাপুরোষিত ও বর্বরোচিত হত্যাকান্ড। কী অপরাধ ছিল এই নিরীহ নিস্পাপ নারীর যার কারণে তাকে এই পরিণতির স্বিকার হতে হলো? উত্তর একটিই হতে পারে, আর তা হলো তার দায়িত্ববান ও নিষ্ঠাপরায়ন স্বামীর সততা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াই ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যা অগনিত কুচক্রি, সন্ত্রাসী ও স্বার্থান্বেষী মানুষের অন্যায় আবদারে বাধ সেধেছে। আর সে কারণেই স্ত্রীকে হত্যা করে বাবুল আক্তারের উপর প্রতিশোধ, কিন্ত এ প্রতিশোধ শুধু তার বিরুদ্ধে নয়, বরং তার সমগ্র পরিবার, স্বজন্, এমনকি সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধে। এরকম বর্বরতা মধ্যযুগ নয়, জাহেলী যুগকেও হার মানায়।

ffdfsdfusbdd
এ পৈচাশিকতার সংস্কৃতি নতুন নয়। বাংলাদেশের সৃষ্টি লগ্নেই বুদ্ধিজীবি হত্যার মাধ্যমে দেশের সৎ, সাহসী ও নিষ্ঠাবান মানুষদের হত্যার গোড়াপত্তন হয়েছিল, যা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও কোনো শাসকই শুন্যের কোটায় আনতে পারেননি। কিন্ত সমসাময়িক ঘটনাগুলোর দিকে নজর দিলে নি:সন্দেহে বলা যায়, সর্বকালের সব ইতিহাস ব্রেক হতে চলছে। এই পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা তো দূরে থাক, লাগামেরই যে হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
সবথেকে উদ্বেগজনক ঘটনা হচ্ছে, সম্প্রতি সময়ের হত্যাকান্ড গুলোর ধরণ প্রায় সবই একই, কিন্ত কোনোটিরই বিচার তো পরের কথা সত্যিকারের মটিভই সুস্পষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম স্যারের মত অত্যন্ত নিরীহ, বিবাদহীন মানুষটিকেও ঠিক মাহমুদা খানমের মত সাতসকালে বাসার সন্নিকটেই হত্যা করা হয়েছিল। আরেকটু পেছনে ফিরলে দেখা যাবে আরো বেশ ক’জন শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্লগার, ব্যাবসায়ী, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের একই পরিণতি, এমনকি গত বছর নভেম্বরে আশুলিয়াতেও একইভাবে হত্যা করা হয়েছিল একজন দায়িত্বরত পুলিশ অফিসারকে। এর বাইরেও তো আছে তনু হত্যার মত আরো কত ধরনের পৈচাশিকতা। যা কোনো ধর্ম তো দূরে থাক বিবেক সম্পন্ন কোনো মানুষের দ্বারাই ঘটানো কিংবা সমর্থন দেয়া পুরোপুরিই অসম্ভব।
তবে, মাহমুদা খানমের ঘটনাটি সকল পূর্বোক্ত ঘটনা থেকে বেশী গুরুত্ব রাখে এই অর্থে যে, পুর্বোক্ত ব্যক্তিদের থেকে এখানে একটি আলাদা নিরাপত্তা বলয় ছিল একজন উর্ধতন পুলিশ অফিসারের সহধর্মিনী হিসেবে। কিন্ত সেরকম পরিবেশের মধ্যেও যখন দুর্বৃত্তরা এই দু:সাহস দেখাতে সক্ষম হয়েছে তাতেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে তাদের অবস্হান কতটা শক্তিশালী। এখানে আরো একটি সমীকরণের ব্যাপার হলো, নিয়মিতই একজন পুলিশ সদস্য তাঁর সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যেতেন কিনত আজ ঐ সদস্যের এবং স্বামীর অনুপস্হিতিতে তিনিই নিয়ে যেতে বের হন, আর সেখানেই বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে। প্রশ্ন হলো তিনি যে আজকে বের হবেন হয় এটি হত্যাকারীরা জানত অথবা তাঁর পেছনে দুর্বৃত্তরা দীর্ঘদিন যাবত সুযোগ সন্ধানে লেগেছিল, যার দ্বারাও তাদেও নেটওয়ার্কের শক্তি পরিমাপ করা যায়। আরেকটি দু:খজনক সত্য হচ্ছে, এই পরিবার নাকি দীর্ঘদিন যাবতই ক্ষতির আশংকায় ভুগছিলেন যেটি সম্পর্কে মাহমুদা খাতুনের প্রতিবেশীর বক্তব্য থেকে জানা যায় এবং তাঁরা নাকি বাসা চেন্জ করারও চিন্তা করেছিলেন। নিরাপত্তায় নিয়োজিত একজন উর্ধ্বতন অফিসারের পরিবারের ক্ষেত্রেই যদি এরকম হয় তাহলে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব কতটা তা খুব সহজেই আচ করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে কোনো বিবেকবান মানুষই এমন জঘন্য কাজ করতে পারেন না সেখানে এই বিবেকহীন পাষন্ড মানুষগুলোর আবির্ভাব কোথ্থেকে ঘটলো? এরা নিশ্চয়ই ভিনগ্রহবাসী নয়, এই দেশ, সমাজ ও কারো না কারো পরিবারেরই অংশ। যারা সবার অলক্ষ্যে সব কুকর্ম দিনের পর দিন করে যাচ্ছে। এদেরকে আরো বাড়তে দিলে ক্রমান্বয়ে এই ভ’মি মানুষের বসবাস থেকে দিনে দিনে পশুদের চারণক্ষেত্রে পরিণত হবে। যাদের কালো থাবা থেকে আপনি, আমি কেউই নিরাপদ নই।
সুতরাং সময় এসেছে, দল মত নির্বিশেষে কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই একপক্ষ আরেক পক্ষকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দোষারোপ না করে, দোষীদেরকে দলমতের বাহিরে দোষী হিসেবেই বিবেচিত করে খুজে বের করা ও যথাযত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা এবং সে ক্ষেত্রে নির্দোষ কেউ যাতে কোনো ভাবেই ভুক্তভোগী না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখা। সেক্ষেত্রে আইন শৃংখলা বাহিনীর সজাগ, কৌশলী ও নিরপেক্ষ দৃষ্টি যেরকম প্রসারিত হওয়া জরুরী, ঠিক একইভাবে সর্বস্তরের জনগনকেও আশে পাশের অপরাধীদেও বিষয় সঠিক তথ্য দিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীকে সহযোগীতা প্রদান, কোনোক্রমেই অপরাধীকে আশ্রয় প্রদান না করা এবং কোনো কারণেই যাতে নিজের পরিবারের কেউ অপরাধ কার্যক্রমে জড়িয়ে না যায় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরী।
হয়তবা সবার প্রচেষ্টায় অপরাধীরা ধরা পড়বে, সমাজে পরিবর্তন আসবে। কিন্ত বাবুল আক্তার কি তাঁর স্ত্রীকে এবং সন্তান কি তার মাকে খুজে পাবে? শুধু তাই নয়, আজ মাহমুদা খানমেরর শিশু সন্তানের জুতোয় যে মায়ের রক্তের ˜াগ লেগে আছে তা কি কোনো ভাবেই মুছে ফেলা যাবে? এ ট্রাজেডি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ছয় শব্দের উপন্যাস ”ঋড়ৎ ংধষব: নধনু ংযড়বং, হবাবৎ ড়িৎহ” এর আবেদনকেও হার মানিয়েছে। আজ তনুর বাবা মা কি তাদের সন্তানকে ফিরে পাবে? রয়েছে এরকম হাজারো প্রশ্ন। তবুও আমরা নিরাশ হতে চাই না, আমরা চাই সমাজের পরিবর্তন। যে পরিবর্তন হবে মুল্যবোধের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে। আসুন সবাই মিলে কাজ বিহীন বুলি না আওড়িয়ে সমাজের পজিটিভ পরিবর্তনের অংশ হই। দেশ, জাতি ও সর্বোপরি মানবতার স্বার্থে নিজের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুতি গ্রহন করি।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক (এমফিল গবেষনারত)
ইমেইল: সড়ংযরঁৎবঁ@মসধরষ.পড়স

Leave a comment

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>